বাতিঘরের মানুষ | Lighthouse man
বাতিঘরের মানুষ
সমুদ্রের একেবারে শেষ প্রান্তে, জনমানবহীন একটি ছোট দ্বীপে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো বাতিঘর। দিনের বেলায় সেটিকে সাধারণ একটি ইট-পাথরের স্থাপনা মনে হলেও, রাত নামলেই তার আলো অন্ধকার সমুদ্র চিরে দূরের জাহাজগুলোকে পথ দেখাত।
সেই বাতিঘরে একাই থাকতেন একজন বৃদ্ধ—সালেহ উদ্দিন।
কেউ জানত না তিনি কত বছর ধরে সেখানে আছেন।
কেউ বলত বিশ বছর।
কেউ বলত চল্লিশ।
কিন্তু তিনি কখনো নিজের অতীত নিয়ে কথা বলতেন না।
প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে তিনি বাতিঘরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেন, বিশাল লণ্ঠনটি পরিষ্কার করতেন, কাচ মুছতেন, তারপর সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বালিয়ে দিতেন।
একদিন শহর থেকে এক তরুণ সাংবাদিক এলেন।
তিনি জানতে চাইলেন,
"চাচা, এত বছর ধরে একা থাকেন। কখনো বিরক্ত লাগে না?"
বৃদ্ধ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
"যে মানুষের কাজ অন্যকে পথ দেখানো, তার একাকীত্ব নিয়ে অভিযোগ করার সময় থাকে না।"
সাংবাদিক অবাক হলেন।
তিনি আরও জিজ্ঞেস করলেন,
"আপনি তো জানেনও না, আপনার আলো দেখে কত মানুষ বেঁচে যায়।"
বৃদ্ধ বললেন,
"সব ভালো কাজের ফল নিজের চোখে দেখতে হয় না। বিশ্বাস করলেই যথেষ্ট।"
সাংবাদিক কয়েক দিন সেখানে থাকলেন।
তিনি লক্ষ্য করলেন, ঝড় হোক বা প্রবল বৃষ্টি—একদিনের জন্যও বাতিঘরের আলো নিভে না।
এক রাতে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
সমুদ্রের ঢেউ যেন পাহাড়ের মতো উঁচু।
হঠাৎ বাতিঘরের আলো নিভে গেল।
বৃদ্ধ কোনো কথা না বলে হাতে একটি ছোট লণ্ঠন নিয়ে ওপরে দৌড়ে গেলেন।
প্রচণ্ড বাতাসে বারবার আগুন নিভে যাচ্ছিল।
তবু তিনি হাল ছাড়লেন না।
অবশেষে আবার আলো জ্বলে উঠল।
পরদিন সকালে খবর এল—
রাতের সেই আলো না জ্বললে একটি যাত্রীবাহী জাহাজ পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেত।
শত শত মানুষ হয়তো আর বাঁচত না।
সাংবাদিক বৃদ্ধকে বললেন,
"আপনি তো একজন নায়ক!"
বৃদ্ধ হেসে উত্তর দিলেন,
"না বাবা, আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি।"
কয়েক মাস পরে বৃদ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
সরকার থেকে নতুন একজন বাতিঘর রক্ষক পাঠানো হলো।
যাওয়ার আগে বৃদ্ধ তাকে শুধু একটি কথা বললেন—
"মনে রেখো, এই আলো তোমার জন্য নয়। তাদের জন্য, যারা অন্ধকারে পথ হারিয়েছে।"
কয়েক দিনের মধ্যেই বৃদ্ধ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
তার মৃত্যুর খবর কোনো বড় পত্রিকার শিরোনাম হয়নি।
কোনো টেলিভিশন অনুষ্ঠানও হয়নি।
কিন্তু সেই রাতেও বাতিঘরের আলো যথারীতি জ্বলেছিল।
বহু বছর পর এক নাবিক তার নাতিকে নিয়ে সেই দ্বীপে এলেন।
নাতি জিজ্ঞেস করল,
"দাদু, এই বাতিঘর এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?"
বৃদ্ধ নাবিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
"অনেক বছর আগে ভয়ঙ্কর এক ঝড়ে আমাদের জাহাজ দিক হারিয়ে ফেলেছিল। চারদিকে শুধু অন্ধকার। ঠিক তখনই এই বাতিঘরের আলো জ্বলে উঠেছিল। আমরা বেঁচে ফিরেছিলাম।"
নাতি আবার জিজ্ঞেস করল,
"যিনি আলো জ্বালিয়েছিলেন, তাঁর নাম কী ছিল?"
নাবিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"আমি জানি না।"
ছেলেটি অবাক হয়ে বলল,
"যাঁর জন্য তুমি বেঁচে গেলে, তাঁর নামই জানো না?"
নাবিক আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
"সব মানুষের নাম মনে রাখা যায় না। কিন্তু কিছু মানুষের কাজ সারাজীবন মনে থাকে।"
সেদিন সূর্য ধীরে ধীরে সমুদ্রের বুকে ডুবে যাচ্ছিল।
আবারও বাতিঘরের আলো জ্বলে উঠল।
মনে হচ্ছিল, সেই বৃদ্ধ এখনো যেন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন, কাচ মুছছেন, আর অন্ধকারকে বলছেন—
"তুমি যত গভীরই হও, একটি ছোট আলোই তোমাকে হারানোর জন্য যথেষ্ট।"
সত্যিই, পৃথিবী আজও টিকে আছে শুধু বড় বড় মানুষের কারণে নয়।
বরং সেইসব নীরব মানুষের জন্য, যারা কোনো প্রশংসা চায় না, কোনো পরিচয় চায় না, কোনো প্রতিদানও চায় না।
তারা শুধু নিজেদের আলো জ্বালিয়ে রাখে।
আর সেই আলোয় অগণিত অচেনা মানুষ নিরাপদে নিজের গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
