যে মানুষটি নিজের নাম রেখে যায়নি | The man who didn't leave his name
যে মানুষটি নিজের নাম রেখে যায়নি
শহরের মাঝখানে একটি পুরোনো পার্ক ছিল। ভোরবেলা সেখানে মানুষ হাঁটতে আসত, সন্ধ্যায় শিশুরা খেলত। পার্কের এক কোণে একটি কাঠের বেঞ্চ। সেই বেঞ্চে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় একজন বৃদ্ধ এসে বসতেন।
তিনি কারও সঙ্গে বেশি কথা বলতেন না।
শুধু মানুষকে দেখতেন।
কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ জীবনের হিসাব কষছে।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সায়েম সেই বেঞ্চে এসে বসল।
তার মুখে ক্লান্তির ছাপ।
চোখে ঘুম নেই।
হাতে চাকরির আবেদনপত্র।
বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন,
"কী ভাবছ?"
সায়েম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"জীবনে এত চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। মনে হয় আল্লাহ আমাকে ভুলে গেছেন... আবার মনে হয় পৃথিবীও আমাকে চায় না।"
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
"একটা প্রশ্ন করি?"
"করুন।"
"তুমি কি কখনো দেখেছ, সূর্য ওঠার আগে পৃথিবী সবচেয়ে বেশি অন্ধকার হয়ে যায়?"
সায়েম মাথা নাড়ল।
বৃদ্ধ বললেন,
"জীবনও ঠিক তেমন। অনেকেই শেষ মুহূর্তে হাল ছেড়ে দেয়, অথচ আলো তখনই আসতে থাকে।"
পরদিনও সায়েম এল।
তার পরদিনও।
এভাবে প্রায় এক মাস।
প্রতিদিন বৃদ্ধ তাকে একটি করে শিক্ষা দিতেন।
একদিন বললেন,
"ক্ষমা করতে শিখো।"
আরেকদিন বললেন,
"যে মানুষ নিজের রাগকে জয় করতে পারে, সে অনেক যুদ্ধ না করেও বিজয়ী হয়।"
আরেকদিন বললেন,
"অন্যের সাফল্য দেখে হিংসা করো না। কারণ তুমি জানো না, সেই সাফল্যের পেছনে কত কান্না লুকিয়ে আছে।"
সায়েমের জীবন বদলাতে শুরু করল।
সে আবার পড়াশোনায় মন দিল।
নিজেকে গুছিয়ে নিল।
ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করল।
এক বছর পরে সে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেল।
প্রথম বেতন হাতে পেয়ে সে সোজা পার্কে চলে গেল।
বৃদ্ধকে ধন্যবাদ দেবে।
কিন্তু বেঞ্চটি খালি।
পরদিনও নেই।
তার পরদিনও নেই।
পার্কের মালীকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন,
"ওই বৃদ্ধ? তিন মাস আগে তো মারা গেছেন!"
সায়েম হতবাক।
"অসম্ভব! আমি তো প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি!"
মালী অবাক হয়ে বললেন,
"এই বেঞ্চে মানুষ অনেকেই বসে। হয়তো তুমি অন্য কাউকে দেখেছ।"
সায়েম আর কিছু বলল না।
বেঞ্চটির নিচে চোখ পড়তেই একটি ছোট লোহার বাক্স দেখতে পেল।
বাক্সটি খুলে সে দেখল, ভেতরে একটি ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
"যদি তুমি এই ডায়েরি খুঁজে পাও, তাহলে বুঝব আমার কাজ শেষ হয়নি। এখন থেকে বাকিটা তোমার।"
পরের পাতাগুলোতে কোনো বড় বড় উপদেশ ছিল না।
ছিল শুধু বাস্তব অভিজ্ঞতা।
একটি পাতায় লেখা—
"আজ একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ালাম। সে আমাকে ধন্যবাদ দেয়নি। ভালোই হয়েছে। ভালো কাজের মূল্য ধন্যবাদে নয়।"
আরেক পাতায়—
"আজ একজন আমাকে অপমান করল। উত্তর দিইনি। কারণ প্রতিটি লড়াই জেতার দরকার নেই।"
আরেক পাতায়—
"মানুষ তোমার কথা মনে রাখবে না। মনে রাখবে, তোমার আচরণ।"
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল—
"যেদিন দেখবে মানুষ তোমার নাম ভুলে গেছে, কিন্তু তোমার কাজ এখনো মানুষের উপকার করছে—সেদিন বুঝবে, তুমি সত্যিই বেঁচে আছ।"
নিচে কোনো স্বাক্ষর নেই।
কোনো নাম নেই।
শুধু একটি বিন্দু।
সায়েম সেই দিন একটি সিদ্ধান্ত নিল।
সে ডায়েরিটি নিজের কাছে রাখবে না।
বরং প্রতি বছর একজন সংগ্রামী মানুষের হাতে তুলে দেবে।
শর্ত একটাই—
সে পড়ে শেষ করলে আবার অন্য কারও হাতে দেবে।
বছরের পর বছর কেটে গেল।
ডায়েরিটি এক শহর থেকে আরেক শহরে, এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের হাতে ঘুরতে লাগল।
কেউ জানত না, এর লেখক কে।
কিন্তু অজানা সেই মানুষটির কথাগুলো হাজার মানুষের জীবনে সাহস হয়ে ফিরে আসতে লাগল।
অনেক বছর পর বৃদ্ধ বয়সে সায়েম আবার সেই পার্কে এল।
বেঞ্চটি এখনো আছে।
শুধু কাঠগুলো পুরোনো হয়ে গেছে।
সে বেঞ্চে হাত রেখে আস্তে করে বলল,
"আপনার নাম আমি আজও জানি না। কিন্তু আপনার শেখানো জীবন আমি ভুলিনি।"
হালকা বাতাস বইতে লাগল।
গাছের শুকনো পাতা মাটিতে পড়তে লাগল।
সায়েমের মনে হলো—
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নাম নয়।
তার রেখে যাওয়া প্রভাব।
কারণ নাম একদিন মুছে যায়।
সম্পদ একদিন অন্যের হয়ে যায়।
ক্ষমতা একদিন শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু একটি ভালো কাজ, একটি সত্য কথা, কিংবা একটি মানুষের হৃদয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া আশার আলো—সেগুলো সময়ের কাছেও হার মানে না।
আর হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকে।
তাদের নামে নয়—
তাদের কর্মে।
